খবরের বিস্তারিত...

prophet nabi

রাসূল (দ:) কি আমাদের মত মানুষ ?’ : সহজ সরল জবাব – গোলাম দস্তগীর লিসানী

‘রাসূল (দ:) কি আমাদের মত মানুষ ?’ – সহজ সরল জবাব
® গোলাম দস্তগীর লিসানী

প্রথম কথা: রাসূল (দ:) কি মানুষ?

হ্যাঁ। তিনি গঠনে, আকারে, প্রাকৃতিকতায় মনুষ্যরূপের অধিকারী।

দ্বিতীয় কথা: রাসূল (দ:) কি আমাদের মত মানুষ?

না। আল্লাহ ঈমানদার তথা বিশ্বাসীদের মানা করেছেন আমাদের মত মানুষ বলতে।

’তোমরা এই রাসূল (দ:)-কে সেইভাবে সাব্যস্ত করো না, যেভাবে পরস্পরকে সাব্যস্ত/আহ্বান করো’।

আর ক্বাফিরদের সাথে তর্কে না জড়িয়ে রাসূল (দ:)-কে কাফিরদের উদ্দেশ্যে বলতে বলেছেন, ’আপনি বলে দিন, আমি তোমাদের ‘উপমায়’ মানুষ আকৃতিসম্পন্ন, আমার প্রতি ওয়াহি (ঐশী বাণী) নাজিল হয়’।

এখন, কোন্ আয়াত আমাদের প্রতি প্রযোজ্য?

আমরা কাফির হলে কাফিরের আয়াত প্রযোজ্য। কাফিররা বলবে নবী তাদের মত মানুষ। আর মুমিনরা বলবেন, নবী (দ:) আমাদের মুমিনদের কারোর মত-ই নন।

তিনি চল্লিশ দিন না খেয়ে থাকতেন। মানুষ ২৩ দিনের বেশি না খেয়ে, না পান করে বাঁচে না। তিনি আমাদের মত মানুষ নন।

তিনি যত জগৎ আছে, সমস্ত জগতের প্রতি আল্লাহ যা করুণা পাঠান, সেই করুণার মাধ্যম। কোন সাধারণ মানুষ বা অসাধারণ মানুষ এই পর্যায়ে পড়েন না।

তৃতীয় কথা: রাসূল (দ:)-কে কি কুরআন-হাদীসে নূর বলা হয়েছে?

হ্যাঁ। তাঁকে ‘সিরাজাম মুনীরা’ বলা হয়েছে। সিরাজ মানে জ্বলন্ত। জ্বলজ্বলে। মুনীর মানে আলোকোজ্জ্বল। সিরাজাম মুনীরা মানে প্রোজ্জ্বল প্রদীপ।

চতুর্থ কথা: তাঁকে কি আল্লাহর পক্ষ থেকে ’নূর’ (জ্যোতি) বলা হয়েছে?

হ্যাঁ। তাঁকে হত্যাচেষ্টার পর বলা হয়েছে, ’তারা চায় আল্লাহর পক্ষ থেকে নূরকে (নূরুল্লাহ) ফুঁ দিয়ে নিভানোর চেষ্টা করতে। কিন্তু তা সম্ভব নয়’।
সূরা নূর-এ তাঁর মোবারক শরীরের বর্ণনা করে তাঁর ক্বলবের ভিতরে আল্লাহর নূর থাকার কথা বলা হয়েছে।
আরও বলা হয়েছে, ’নিশ্চয়ই তোমাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছেন এক নূর এবং সুস্পষ্ট কিতাব’।

পঞ্চম কথা: কুরআনে কি তাঁকে মনুষ্যরূপী বলা হয়েছে?

হ্যাঁ। মানুষের ’উপমায়’ (মাসালু) বলা হয়েছে। তিনি জাগতিক গঠন ও প্রকৃতিতে মনুষ্য আকৃতি ও প্রকৃতির। কিন্তু তাঁর সাথে দ্বিতীয় কোন মানুষের তুলনা চলে না। যেমন হযরত ঈসা (আ:) দ্বিতীয় কোন মানুষের সাথে তুলনীয় নন। তিনি রূহুল্লাহ। যেমন আদম (আ:) দ্বিতীয় কোন মানুষের সাথে তুলনীয় নন; তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে ফুৎকারপ্রাপ্ত এবং সকল মানুষের পিতা। তেমনি রাসূল (দ:) দ্বিতীয় কোন মানুষের সাথে তুলনীয় নন। তিনি জাগতিক প্রকৃতিতে মনুষ্য আকৃতির হয়েও ’নূরুল্লাহ’।

ষষ্ঠ কথা: কুরআনে কি তাঁকে বারবার মানুষ বলা হয়েছে?

না। আল-কুরআনে বেশিরভাগ জায়গাতেই তাঁকে ‘আর সব মানুষের মত মানুষ’ বলেছে শুধু কাফিররা। কাফিরদের জবানিতে এই কথাটা বারবার বলা হয়েছে।

সপ্তম কথা: রাসূল (দ:) নূর, এই বিষয়ক কোন অকাট্য, অনস্বীকার্য প্রমাণ কি রয়েছে?

হ্যাঁ। ইসলামে তা-ই অকাট্য প্রমাণ, যা আল-কুরআনে থাকে এবং সরাসরি কোন সাহাবী (রা:) দ্বারা তা সত্যায়িত হয়ে হাদীসে/রওয়ায়াতে পরিণত হয়।
কুরআনের প্রথম ব্যাখ্যাকার হলেন রাসূল (দ:)-এর চাচা হযরত আব্বাস (রা:)-এর পুত্র হযরত আবদুল্লাহ (রা:), যিনি শিশুকাল থেকে রাসূল (দ:)-এর সেবায় নিয়োজিত ছিলেন এবং রাসূল (দ:)-এর কথা অনুযায়ী পৃথিবীর প্রথম তাফসীরকারী।

পৃথিবীর প্রথম লিখিত কুরআন ব্যাখ্যাকারী (তাফসীরকারী) যদি স্বয়ং কোন সাহাবী (রা:) হন, যিনি রাসূল (দ:)-এর সাথে অনেক সময় কাটিয়েছেন, তাহলে তাঁর লিখিত কথা ইসলামের অনস্বীকার্য বিষয়।

তাফসীরে ইবনে আব্বাস (রা:)-এ লেখা রয়েছে, “তোমাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে মহান কিতাব, অর্থাৎ, আল-কুরআন এবং ’নূর’, অর্থাৎ, এই রাসূল (দ:) এসেছেন। স্বয়ং এই
সাহাবী (রা:)-এর লেখার উপরে কোন ব্যাখ্যা চলে না।

অষ্টম বিষয়: রাসূল (দ:) কি গাঠনিকভাবেও নূর?

হ্যাঁ, এই ধরনের অনেকগুলো হাদিস রয়েছে।

নবম বিষয়: নূর হয়েও কি কারো পক্ষে মনুষ্য আকৃতিতে থাকা ও মানুষের সবকিছুতে যুক্ত থাকা সম্ভব?

হ্যাঁ। নূর বা আলো হল ফোটনের ওয়েভ বা ফোটনের প্যাকেট। ফোটন কাঁচা শক্তি। সৃষ্টির যে কোন বস্তুকণাকে বিশ্লিষ্ট করলে অণুতে এসে ঠেকে। অণুর বিশ্লিষ্টকরণে ইলেক্ট্রন বা প্রোটন-ই সর্বনিম্নভরের কণা। ইলেক্ট্রন আর প্রোটনের কোয়ার্ক লেভেলে ভাঙলে শুধু শক্তি থাকে। শক্তির আট রূপের এক রূপ আলো। শক্তি একত্র হয়ে যদি বস্তু তৈরি হতে পারে, আলোর সাথে মানব শরীরের কোন অসামঞ্জস্য নেই।

দশম বিষয়: আমরা কি তাকে আমাদের মত মানুষ সাব্যস্ত করতে পারব?

না। মানবীয়তায় আগত হিসাবে মনুষ্যরূপী সাব্যস্ত করতে পারব। কিন্তু দ্বিতীয় কারো সাথে তুলনা করতে পারব না। আমাদের মত মানুষ সাব্যস্ত করতে পারব না।
কারণ, তাঁকে শাহিদ তথা সাক্ষ্যদাতা বলা হয়েছে। কুরআনে বলা হয়েছে, প্রত্যেক উম্মাহর সব কাজের শাহিদ বা সাক্ষী হলেন সেই উম্মাহর নবী ও রাসূল। এবং জগতের সমস্ত উম্মাহর নবী ও রাসূলের সকল কাজের উপর সাক্ষ্যদাতা হিসাবে রাসূল (দ:)-কে উপস্থিত করা হবে। যিনি দেখেন না, তিনি সাক্ষ্যদাতা হতে পারেন না; অধিকন্তু রাসূল (দ:)-কে সত্য-মিথ্যার প্রভেদকারী হিসাবে ক্ষমতাপ্রদান করা হয়েছে; এবং তিনি যে সশরীরে জীবিত আছেন তা কুরআনের তিনটি আয়াতের দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে; তার মধ্যে প্রথমটিতে বলা হয়েছে, ’আল্লাহর পথে প্রাণপাতকারী (শহীদদের) মৃত বলো না, বরং তারা জীবিত এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে রিযিক-প্রাপ্ত হন।’ আর শহীদের মর্যাদা সিদ্দিকবৃন্দ তথা বুযূর্গানে দ্বীন ও আম্বিয়া (আ:)-মণ্ডলীর পরে; তা কুরআনে আছে ’মিনান নাবিয়্যিনা ওয়াস সিদ্দিকিনা ওয়াশ শুহাদায়ি ওয়াস স্বালিহিন’, এই আয়াতে।

মহানবী (দ:)-কে পূর্বাপার সম্ভাব্য সবচে বেশি বিষয় জানানো হয়েছে। ‘আল্লাহ ছাড়া অজ্ঞাতবিষয়ের জ্ঞান কারো নেই। কিন্তু তিনি প্রিয়জনদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তাঁকে যতটা ইচ্ছা জ্ঞাত করেন’ – এই আয়াতে আল্লাহর প্রিয়জনের অজানা বিষয়ে দখলের কথা বলা হয়েছে এবং বুখারী-মুসলিম থেকে শুরু করে ৫৬ টা হাদিস গ্রন্থের হাদিসে দেখা যায়, রাসূল (দ:) এক ভোর থেকে শুরু করে মসজিদে সেদিন সন্ধ্যার মধ্যে কিয়ামাত পর্যন্ত যা যা ঘটবে এমন সব ঘটনাবৃত্তান্ত বর্ণনা করেন এবং প্রতিটা ঘটনায় খোদাদ্রোহী তথা দাজ্জালদের কথা বর্ণনা করেন এবং সেই বর্ণনায় রাসূল (দ:) ৩০ জনেরও বেশি ভবিষ্যত খোদাদ্রোহীর নাম, তাদের পিতার নাম ও তাদের গোত্রের নাম পর্যন্ত বর্ণনা করেন। এই হাদিস হযরত উমার (রা:)-সহ ১৫ জনেরও বেশি সাহাবা (রা:) বর্ণনা করেছেন।

এইসব গুণ সাধারণ মানবিক গুণ নয়, বরং অতিমানবিক আল্লাহপ্রদত্ত অসাধারণ গুণ। তাঁকে তাই কোন মানবিক তুলনায় আনা সম্ভব নয়।

একাদশ বিষয়: তিনি কী, এটা কি গুরুত্বপূর্ণ?

হযরত ঈসা (আ:)-এর ’রূহুল্লাহ’ হওয়া এবং পিতা ব্যতিরেকে জন্মানো, এটা যেমন মুসলিমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, হযরত আদম (আ:)-এর মানবজাতির আদি-পিতা হওয়া, এই আকীদা-বিশ্বাস যেমন মুসলিমের জন্য জরুরি, তার চেয়েও ঢের বেশি গুরুত্বপূর্ণ আপন রাসূল (দ:)-এর বিষয়ে সঠিক আকীদা-বিশ্বাস ধারণ করা।
মুসলিম হয়ে থাকলে এই সঠিক বিশ্বাস অন্তরে পোষণ ঈমানেরই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।

বটমলাইন বা মোদ্দা কথা হচ্ছে, রাসূল (দ:)-কে যখন আমরা মনুষ্যরূপী বলব তখন সেই তুলনায় নিজেকে মানুষ বললে শেষ। আর নিজেকে যখন মানুষ বলব তখন রাসূল (দ:)-কে সাধারণ মানুষ না বলা-ই ভাল। কারণ, তিনি-ই ঈমান। আর ঈমান সামান্য কথায় বিকিয়ে দেয়ার বিষয় নয়। প্রতিটা মানুষ-ই জানেন, তার মনের ভিতরে কী পরিমাণ পাপ ঘুমে বা জাগরণে, স্থির অবস্থায় বা ভ্রমণে, মসজিদে কী ডাস্টবিনে – সর্বত্র-ই পুঞ্জিভূত থাকে! এই মহাপাপী চরম জঘন্য মানুষ যদি আল্লাহর রাসূল (দ:)-কে নিজের মত মনে করে, তাহলে তার আর মুসলিম দাবি না করাই ভাল।

 

Comments

comments

Related Post